জেন-জি গণ-অভ্যুত্থানের পর নেপালে নির্বাচন, নতুন নেতৃত্বের তীব্র লড়াই
ভয়াবহ গণবিক্ষোভ ও রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা জেন–জি আন্দোলনের পর নেপালে প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ)।
ছয় মাস আগে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলির সরকারের পতনের পর আয়োজিত এই ভোটকে দেশটির গণতন্ত্রের ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। খবর ইন্ডিয়া টুডের।
হিমালয়বেষ্টিত দেশটির ২৭৫ সদস্যের প্রতিনিধি পরিষদের জন্য অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে মোট ৩ হাজার ৪০৬ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। বিশ্লেষকদের মতে, এই ভোট অনেকটাই পুরোনো রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি জনসমর্থন আছে কি না—তার এক ধরনের গণভোট। একই সঙ্গে জেন-জি আন্দোলনের দাবি রাজনীতিতে স্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে কিনা, সেটিও নির্ধারণ করবে এ নির্বাচন।
গত বছরের ৮ ও ৯ সেপ্টেম্বর তরুণদের নেতৃত্বে দুই দিনের তীব্র বিক্ষোভের মুখে কেপি শর্মা অলির সরকারের পতন ঘটে। ওই সহিংসতায় ৭৭ জন নিহত এবং দুই হাজারের বেশি মানুষ আহত হন। পরে প্রেসিডেন্ট রামচন্দ্র পৌডেল সংসদ ভেঙে দেন এবং সাবেক প্রধান বিচারপতি সুশীলা কার্কিকে তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব দেন। তিনি নেপালের ইতিহাসে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী।
নির্বাচনের আলোচিত প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক কাঠমান্ডু মেয়র বলেন্দ্র শাহ। র্যাপার থেকে রাজনীতিতে আসা ৩৫ বছর বয়সি এ নেতা ‘ব্যালেন’ নামেই বেশি পরিচিত। দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান ও প্রজন্মগত পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে তিনি নিজেকে তুলে ধরেছেন। ঝাপা–৫ আসনে তিনি সরাসরি কেপি শর্মা অলির বিরুদ্ধে লড়ছেন।
চারবারের প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলি আবারও ক্ষমতায় ফেরার চেষ্টা করছেন। তবে আন্দোলনের মাধ্যমে তার সরকারের পতনের পর তরুণ ভোটারদের একটি বড় অংশ তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
অন্যদিকে নেপালি কংগ্রেসের সংস্কারপন্থী নেতা গগন থাপাকেও সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সামনে আনা হয়েছে। দক্ষিণাঞ্চলে তার প্রচার বেশ জোরালো ছিল এবং তাকে নতুন ধারার নেতৃত্বের প্রতিনিধি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এ ছাড়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী পুষ্প কমল দাহাল প্রচণ্ডও নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। সাবেক মাওবাদী বিদ্রোহী এই নেতা ২০০৬ সালে মূলধারার রাজনীতিতে যোগ দেন এবং তিনবার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন।
ছোট কিন্তু উদীয়মান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে রয়েছে উজ্যালো নেপাল পার্টি ও শ্রম শক্তি পার্টি। যদিও তাদের প্রভাব এখনো মূলত আঞ্চলিক পর্যায়েই সীমাবদ্ধ। একই সময়ে নেপালে রাজতন্ত্র পুনর্বহালের আলোচনা নিয়েও রাজনৈতিক অঙ্গনে গুঞ্জন রয়েছে।
দেশটিতে প্রায় এক কোটি ৮৯ লাখ ভোটার এই নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ। সকাল ৭টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চলবে। ভোট শেষে ব্যালট সংগ্রহের পরপরই গণনা শুরু হওয়ার কথা।
এই নির্বাচনকে নেপালের শাসনব্যবস্থা, অর্থনৈতিক সংকট ও বৈদেশিক নীতির জন্য বড় পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও জবাবদিহির অভাব নিয়ে তরুণদের ক্ষোভ পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর চাপ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে দারিদ্র্য ও যুব বেকারত্বের কারণে কর্মসংস্থান এখন বড় ইস্যু হয়ে উঠেছে।
নতুন সরকারকে ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং চীনের বিনিয়োগ—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার চ্যালেঞ্জও মোকাবিলা করতে হবে। নেপালের মোট বাণিজ্যের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ভারতের সঙ্গে, আর অবকাঠামো খাতে চীনের বিনিয়োগও ক্রমশ বাড়ছে।
এবারের ভোটার তালিকায় প্রায় ১০ লাখ নতুন ভোটার যুক্ত হয়েছেন, যাদের বেশিরভাগই জেন–জি প্রজন্মের। তাদের প্রধান দাবি দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, স্বজনপ্রীতির অবসান, নেতৃত্বে প্রজন্মগত পরিবর্তন এবং সুশাসন নিশ্চিত করা।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি মানুষের ক্লান্তি নতুন রাজনৈতিক শক্তির জন্য সুযোগ তৈরি করতে পারে।

